যেতে পারেন সেভেন হিল সিটি লিসবর্ণে

0

সাগর আহমেদ/- পর্তুগালের রাজধানী শহর ও বৃহত্তম নগরী লিসবন যা আটলান্টিক মহাসাগর ও টাগুস নদীর র্তীরে অবস্থিত। লিসবন শহরটি মূলত ৭টি বড় বড় পাহাড় নিয়ে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা গঠিত আধুনিক এক শহর। তাই এই শহর অনেকের কাছে সেভেন হিল সিটি নামেও পরিচিত।

পর্তুগালের নাম শুনলে মনে পড়ে, তাদের গৌরবান্বিত অতীতের কথা। পর্তুগিজরা একটা সময় অর্ধেকের বেশি পৃথিবী শাসন করেছে। এশিয়া থেকে আফ্রিকা এবং সুদূর আমেরিকা পর্যন্ত তাদের শাসন বিস্তৃত ছিল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিল এই পর্তুগিজরা।

পর্তুগিজ নাবিক ও আবিষ্কারক ভাসকো দা গামা ১৪৯৭ সালের জুন মাসে, লিসবনের গা ঘেঁসে বয়ে চলা টাগুস নদী থেকে যাত্রা শুরু করে ১৪৯৮ সালে প্রথম বারের মত দুর্যোগপূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল পাড়ি দিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়ার পথ আবিষ্কার করেছিল। তার সে আবিষ্কার পর্তুগিজদের জন্য বিশাল সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল।ইন্ডিয়ান মসলার বাণিজ্য ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করলো তাদের অর্থনীতিতে। নিমিষেই খুলে গিয়েছিল তৎকালীন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি জাতির সম্ভাবনার দ্বার। অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে গিয়েছিল তাদের ভাগ্যের চাকা।

lisborn_2লিসবনের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হলো গ্রাসায় অবস্থিত, যেখান থেকে পুরো লিসবন ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখা যায়। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর হলো এটি, ইতিহাস বলে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের পরে লিসবনের অবস্থান। যাহা ইতালির রোম শহরের ও আগে স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে এই শহরে ৬ লাখের ও বেশি মানুষের বসবাস এবং এটি একটি মাল্টি কালচ্যারাল শহর যেখানে বিশ্বের ৯৭টির বেশি দেশের মানুষ বসবাস করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০০ বছর আগে প্রথম এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল তাই এই শহরে অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ১৫ টির বেশি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান রয়েছে পর্তুগালে তাই প্রতি বছর প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ পর্তুগাল ভ্রমণ করে এবং এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ আসে এই নগরীর প্রাচীন সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

এখানে অনেক ঐতিহাসিক ও বিশ্ব ঐতিহ্যে এবং দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তাছাড়া দুনিয়ার গোটা কয়েক রাজধানী শহরে সমুদ্র সৈকত রয়েছে তাদের মধ্যে লিসবন অন্যতম। লিসবন সিটি সেন্টার থেকে মাত্র ২০ কি.মি. দূরে সৈকতের অবস্থান যা মাত্র ১৫-২০ মিনিটে আসা যাওয়া করা যায় বাস, ট্রেন বা কারে।

lisborn_1আলফামা হলো লিসবনের অন্যতম প্রাচীন ও পুরাতন এলাকা যেটি ১৭৫৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ও জলোচ্ছ্বাসের পরেও টিকে রয়েছে অক্ষত অবস্থায়। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় জমায় সরু রাস্তা ও প্রাচীন জনপদ দেখার উদ্দেশ্যে।

চলুন জেনে নিই কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান বা দর্শনীয় জায়গা। প্রথমে চলে আসে জেরোমাস মনস্ট্রার এর নাম। মূলত এটি হলো আবিষ্কারক ভাস্কো দ্য গামার সমাধিস্থল। এটি একটি বৃহৎ গির্জা বা মঠ এবং এটিকে বিশ্বের অন্যতম সুদর্শন মট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ষোড়শ শতকে নির্মিত এই সমাধিস্থল বা গির্জাটি একটি বিশ্ব ঐতিহ্য।

১৪৯৮ সালে ভাস্কো দ্য গামার ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রাকে স্মরণ করে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল এবং এর বেশির ভাগ অর্থের যোগান এসেছিল আমাদের উপমহাদেশের মসলা বাণিজ্য থেকে। লিসবন সিটি সেন্টার থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বাস অথবা ট্রামে করে ১৫-২০ মিনিটে পৌঁছানো যায় সহজে।

ক্যাসটোলো ডে সাও জর্জ লিসবনের প্রাণকেন্দ্রে, পাহাড়ের পাদদেশে আলফামার পাশে অবস্থিত। এই রাজ প্রাসাদটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকে লিসবনের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। খুব কাছ থেকে টাগুস নদীর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সামান্য দূরে চোখ ফেললে আটলান্টিকের নীল জলরাশির দেখা মেলবে।

১১৪৭ সালের আগ পর্যন্ত মরিশরা এই প্রসাদ থেকে খ্রিস্টান বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতো কিন্তু ঐ বছর Afonso Henriques এর নেতৃত্বে এই প্রাসাদ দখল করে নেয়। এর মধ্যে অবস্থিত যাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সুউচ্চ দেয়াল ও পর্যবেক্ষন টাওয়ার নিমিষেই যে কারো মন ভাল করে দিতে পারে।

বেলেম টাওয়ার নামে পরিচিত এই দালানটি লিসবনের অন্যতম সেরা প্রতীক। ১৫১৫ থেকে ১৫২১ সালের মধ্যে নির্মিত এই টাওয়ারটি টাগুগ নদীর মাঝে গড়ে তুলেছিল সমুদ্রগামী নৌযান পর্যবেক্ষণ করার জন্য। আবিষ্কারের যুগের অন্যতম সেরা একটি নিদর্শন হিসেবে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৮৩ সালে। এটি পর্যটক আকর্ষণীয় স্থান বেলেম এ অবস্থিত।

পাশে রয়েছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ সেতু ভাস্কো দ্য গামা ব্রিজ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং মনোরম কেবল কার।পর্তুগালের আলগ্রাভ ও আ্যলেনত্যজু সহ অনেক এলাকা সপ্তম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাই কম বেশি লিসবন ও পর্তুগালের সব জায়গায় মুসলিম নিদর্শন ও বিভিন্ন ইসলামী নাম দেখতে পাওয়া য়ায়।

লিসবন ওশেনারিয়াম হলো ইউরোপের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যাকোরিয়াম। ১৯৯৮ সালের লিসবন এক্সপোতে এটির উদ্বোধন হয়েছিল। রহস্যময় নানা সামুদ্রিক প্রাণীর এক কৃত্রিম অভয়ারণ্য, বিশেষ করে আটলান্টিক, ভারত, প্রশান্ত ও অ্যান্টার্টিক মহাসাগরের জীব বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি অ্যাকোরিয়াম।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.