LastNews24
Online News Paper In Bangladesh

প্রস্তাবিত ইউনানী-আয়ুর্বেদিক শিক্ষা আইনে ক্ষুব্ধ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান

প্রস্তাবিত আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এবং তৃতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। একই আইনের অধীনে এই দুটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করার বিধান থাকা বিদ্যমান আইনি রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

0
মহানগর ডেস্ক: নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই আমলে না নিয়ে চূড়ান্ত হয়েছে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২১ এর খসড়া। বিল আকারে মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপিত হবার পর আইনে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। এতে চরম ক্ষুব্ধ এ খাত সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি ও অসংখ্যা প্রতিষ্ঠান।
তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এবং তৃতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। একই আইনের অধীনে এই দুটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করার বিধান থাকা বিদ্যমান আইনি রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এছাড়া চলতি বছরের ২৭ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সোলতান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের উপ-সচিব রাজীব হাসান প্রশ্ন তোলেন যে, একই আইনের অধীনে দুটি আইনগত সত্ত্বা প্রতিষ্ঠিত হবার নজির বাংলাদেশে নেই। তাঁর আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একই আইনে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এবং বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা সাংঘর্ষিক কিনা, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের মতামত নিতে হবে।
কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের মতামত গ্রহণ না করে একতরফাভাবে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২১ এর খসড়া চূড়ান্ত করে। পরবর্তীতে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দ্বিতীয়বারের মতো বিল আকারে উত্থাপন করা হয়।
দেখা যায়, বিদ্যমান অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এর কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে অভিযোগকারীরা বলছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সীমালঙ্ঘনের পরিচয় দিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্তাব্যক্তি। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে আইন লঙ্ঘনের অপরাধে দায়ী করা হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবকে।
প্রস্তাবিত আইনে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড এবং বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিলের কার্যাবলী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মারাত্মক বিরোধের বিধান সংযোজন করা হয়েছে। ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক বোর্ডকে ডিপ্লোমা ইউনানী আয়ুর্বেদিক কলেজের স্বীকৃতি এবং নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের একাডেমিক মান নিয়ন্ত্রণ, তদারকি, পরিদর্শন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ন্যস্ত করা হয়েছে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কাউন্সিলের উপর। ফলে দুটি সংস্থাকে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও সাংঘর্ষিক অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিশ্চিতভাবেই ইউনানী-আয়ুর্বেদিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে মনে করছেন অনেকেই। আর সংস্থা দুটি’র মধ্যে তৈরি হবে ভারসাম্যহীনতা। একই আইনে দুই সংস্থার এরকম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়ার বিধান বাংলাদেশের আর কোনো আইনে নেই।
বর্তমানে বিল আকারে প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া তৈরির সময়েই অবলম্বন করা হয় নিয়মবহির্ভূত পন্থা। স্বাস্থ্য সচিব আলী নূরের সভাপতিত্বে ২০২০ সালের ১৮ মার্চে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন, ২০২০ এর খসড়ায় উল্লিখিত বোর্ড এবং কাউন্সিলের গঠন ও কার্যক্রমের জন্য পৃথক আইনের খসড়া প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু একই বছরের ৫ আগস্ট অর্থাৎ ৫ মাস পরে অদৃশ্য কারণে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই লঙ্ঘন করেন স্বাস্থ্য সচিব।
বিদ্যমান বাংলাদেশ ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ এর হালনাগাদ ও বাংলা অনুবাদ করে নতুন আইন তৈরির কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। এরপর মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয় ‘বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি আইন-২০১৬’ এর খসড়া। এ খসড়াকে যাচাই বাছাই করে চূড়ান্ত করতে ২০১৮ সালের ১৫ মে তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেককে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় ৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। যাচাই বাছাই সাপেক্ষে ১৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে উক্ত কমিটি ‘বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাপদ্ধতি আইন-২০১৬’ এর খসড়া অনুমোদন করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করে।
হঠাৎ ২০২০ সালের ৫ আগস্ট ‘বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাপদ্ধতি আইন-২০১৬’ এর অনুমোদনকৃত খসড়াকে ধামাচাপা দিয়ে বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২০ শিরোনামে আরেকটি হযবরল এবং সাংঘর্ষিক খসড়া আইন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ, সংশয় ও উষ্মা।
বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২০ এর খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি আন্ত:মন্ত্রণালয় ও ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে স্বাস্থ্য সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্টরা ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের উন্নয়নে বহুমাত্রিক সুপারিশ ও যুগান্তকারী প্রস্তাবনা পেশ করেন।
কিন্তু স্টেক হোল্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতগুলো গ্রহণ না করে একতরফাভাবে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উপস্থাপন করা হয়।
এছাড়া, নতুন আইন পাশ হবার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের ১২ হাজার চিকিৎসক বেকারত্বেও তালিকায় নাম লেখাতে বাধ্য হবেন। তাদের চিকিৎসাজীবন পড়ে যাবে চরম অনিশ্চয়তায়। কারণ চলমান অর্ডিন্যান্সের ২৪ ধারায় ১২ হাজার ট্রাডিশনাল হিলার বা মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের বি ক্যাটাগরি রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে চিকিৎসা সেবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিলো। প্রস্তাবিত আইনে ২৪ ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে তৈরি হতে যাচ্ছে সংকট ও আতঙ্ক।
বিদ্যমান অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ অনুযায়ী, ইউনানী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার অধিকার এবং নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখা ও ফি গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনের চূড়ান্ত খসড়ায় এই বিধান বিলুপ্ত করে মোবাইল কোর্টে দণ্ড আরোপের ব্যবস্থা, ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা নগদ এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, এমনকি জামিন অযোগ্য শাস্তির বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এতে চিকিৎসকদের অধিকার যেমন খর্ব হবে, ঠিক তেমনি সঙ্কুচিত হবে ইউনানী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার বিকাশ।
প্রস্তাবিত আইনের আগের খসড়ার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া ছিলো। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত খসড়ায় পুরো ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সংক্রান্ত নির্দেশনা বাদ দেওয়ায় ইউনানী-আয়ুর্বেদিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ রুদ্ধ ও পঙ্গু হতে যাচ্ছে।
এতে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বাংলাদেশ দেশীয় চিকিৎসক সমিতি, বাংলাদেশ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ইউনানী মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইন পাশ হলে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র স্বাস্থ্য খাত নিয়ে স্বপ্ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ধূলিস্যাত হবে। অবিলম্বে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ইউনানী-আয়ুর্বেদিক খাতের হাজার হাজার উদ্যোক্তা।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy