রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ

গণহত্যা এবং ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ নানামুখী ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠন করেছে। এ উদ্দেশ্যে গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর উপস্থিতিতে দু’ দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা ‘মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত অধিবাসীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জেডব্লিউজির কার্যপদ্ধতি’ শিরোনামের একটি দলিলে স্বার করেছেন। উভয় দেশের ১৫ জন করে মোট ৩০ জন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য থাকবেন। নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিবরা। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসন বা ফিরে যাওয়া, সেখানে পুনর্বাসন এবং তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা- এই তিনটি বিষয় তত্ত্বাবধান করবে জেডব্লিউজি। এ উদ্দেশ্যে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা কক্সবাজার এবং রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় যেতে এবং গিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবেন। এসব বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচআরসিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনকে যুক্ত রাখা হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার শুরু হবে আগামী বছর ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর দফতরের মন্ত্রী চ টিন্ট সোয়ে গত ২৩ নভেম্বর একটি চুক্তিতে স্বার করেছিলেন। সে চুক্তির ভিত্তিতেই জেডব্লিউজি গঠন করা হয়েছে। চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিভাবে ও কখন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে, কিভাবে তাদের পরিচয় যাচাই করা হবে, কিভাবে সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে এবং যানবাহন, যোগাযোগ ও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানানোসহ আনুষঙ্গিক সকল বিষয়ে রূপরেখা চূড়ান্ত করবে জেডব্লিউজি। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার েেত্র অগ্রগতি ও সমস্যাসহ সকল বিষয়ে তিন মাস পরপর উভয় দেশের সরকেোরর কাছে রিপোর্ট দেবে জেডব্লিউজি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট ও তার পর আগত রোহিঙ্গাদের ফেরৎ পাঠানো হবে। এটা সম্পন্ন হওয়ার পর গত বছরের অক্টোবর ও তার পর বিভিন্ন সময়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে বলে জেডব্লিউজির দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা জেডব্লিউজি তথা যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথে বিরাট অগ্রগতি বলে মনে করি। কারণ, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে যতবার আহ্বান জানানো হয়েছে ততবারই মিয়ানমার গড়িমসি করে এসেছে। দেশটি এমনকি বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা মুসলিমদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতেও সম্মত হয়নি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কৌশল হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মতির কথা জানালেও মিয়ানমার একই সাথে বলে এসেছে, সকলকে নয়, সাম্প্রতিক সংকটের সময়ে আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্য থেকে দেশটি শুধু সেই সব রোহিঙ্গাকে ফেরৎ নেবে, যাদের কাছে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। মিয়ানমার আরো বলেছে, এসব রোহিঙ্গাকেও ‘যাচাই ও প্রমাণ সাপে’ে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের ‘প্রকৃত’ নাগরিক।
বলা দরকার, মিয়ানমারের এই মনোভাব আশ্বস্ত করার পরিবর্তে বরং গভীর সংশয়েরই সৃষ্টি করেছে। কারণ, ১৯৮০-র দশকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ রোহিঙ্গাদের অবার্মিজ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের ওপর নানামুখী নির্যাতন বেড়েছে এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। তখন থেকেই বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে চলতি বছরের ২৫ আগস্টের পর। এ সময় থেকে শুরু হয়েছে নতুন পর্যায়ের নির্যাতন ও হত্যাকান্ড। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা একে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমন অবস্থায় হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মুখে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাদের কারো পইে পরিচয়পত্র ধরনের কোনো কিছু আনা সম্ভব হয়নি, যা দিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে, তারা রাখাইন প্রদেশের ‘প্রকৃত’ নাগরিক। অর্থাৎ মিয়ানমার যদি ‘যাচাই ও প্রমাণ সাপে’ে ফেরৎ নেয়ও তাহলেও নেবে খুব স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গাকে। অন্যদিকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। তাদের আর কখনো ফেরৎ পাঠানো যাবে না। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬ লাখ ৫৫ হাজার।
অনেক নাটকীয়তা ও গড়িমসির পর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ বা জেডব্লিউজে গঠন করার এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হওয়ার খবর আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক মনে হলেও মঙ্গলবার স্বারিত দলিলে যথেষ্ট ফাঁক রয়েছে বলে কূটনীতিক ও তথ্যভিজ্ঞরা জানিয়েছেন। এর একটি বিশেষ কারণ হলো, ২৩ নভেম্বরের চুক্তির মতো জেডব্লিউজে গঠনের দলিলেও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটির উল্লেখ করা হয়নি। এর পরিবর্তে মিয়ানমারের চাপে বলা হয়েছে ‘রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী’। তাছাড়া প্রত্যাবাসনের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, আগামী বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আশংকার কারণ হলো, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গড়িমসি করেছে। এবার সম্মত হলেও পরিচয় ‘যাচাই-বাছাই’ ধরনের এমন কিছু বিষয়ের ওপর মিয়ানমার জোর দিয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে, যেসব শর্ত পূরণ করতে গেলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে বিপন্ন হতে হবে। তারা নিজেদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে কাগজপত্র দিয়ে প্রমাণই করতে পারবে না। ওদিকে রাখাইনে গ্রামের পর গ্রাম শুধু জ্বালিয়ে দেয়া হয়নি, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি এমন অবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে ফিরে যেতে পারলেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের পে নিজেদের গ্রাম ও ঘরবাড়ি চেনা বা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না। এসব তথ্য জানা গেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ দ্বিপাকিভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অগ্রসর, চুক্তিও করছে যাতে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মহলের অবগতি বা অনুমোদন থাকছে না, যা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মিয়ানমার দ্বিপাকি আলোচনার কোন মর্যাদা দিচ্ছে না। সে রোহিঙ্গা নিধন ও নির্মূল এখনও বন্ধ করেনি এবং রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করছে না, অন্যকেও ব্যবহারে বাধা দিচ্ছে। মিয়ানমারের আলোচনা সময় পেণের কৌশল কিনা এ প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই উঠতে পারে।
সুতরাং সরকারকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পদপে নিতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের সকলেই যাতে ফিরে যেতে পারে এবং নিজেদের বসতভিটায় গিয়ে উঠতে ও নিরাপদে বসবাস করতে পারে- এ সব বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নিতে হবে। আমরা চাই, মিয়ানমার যাতে নতুন পর্যায়ে কোনো কূটকৌশলের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ না করতে পারে এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের সকলেই যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের দেশে ফিরে যেতে সম হয়।

ভাগ