উপকূলে দাদন ব্যবসায়

দেশের দক্ষিণের উপকুলীয় জেলাগুলোতে একশ্রেনীর এনজিওর অবৈধ মাইক্রো ক্রেডিট প্রকল্পের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বৈদেশিক সহায়তার জন্য গড়ে ওঠা শত শত এনজিও এবং সমিতি এখন কার্যত ুদ্র্ঋণের নামে দাদন ব্যবসায় নেমেছে। বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং এনজিও সমবায় ও সঞ্চয়-ঋনদান সমিতির কথিত মাইক্রো ক্রেডিট অধিক লাভজনক হওয়ায় বেড়ে গেছে এদের সংখ্যা। অতীতের মহাজনী দাদন ব্যবসার স্থলাভিষিক্ত এসব এনজিও ও সমিতি কার্যত উচ্চ সুদে অবৈধ ব্যাংকিং ব্যবসায় করছে। এদের শতকরা ৯০টিরই এনজিও ব্যুরো বা সমাজসেবা অধিদফতরের কোন অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। স্বল্প কিছু সংখ্যক সমিতি বা এনজিওর অনুমোদন থাকলেও তাদের এ ধরনের মাইক্রো ক্রেডিট বা ব্যাংকিং ব্যবসার কোন বৈধতা নেই। দেশের তফশিলি ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর মত এসব এনজিও বা সমিতির জামানত রা বা জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা না থাকায় অর্থ আমানত জমাদানকারি বা ঋনগ্রগিতাদের আইনগত নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা না থাকায় প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে মানুষ। একদিকে ঋণ নিয়ে এবং বেশী লাভের আশায় এসব সমিতিতে টাকা জমা করে প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ অন্যদিকে অবৈধ লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবসায় সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শুধু উপকূলীয় অঞ্চলেই নয়, সারাদেশেই এ ধরনের এনজিও ও মাইক্রোক্রেডিট সমিতির জমজমাট ব্যবসায় বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই এমন বিস্তৃতি সম্ভব হয়েছে। হাজার হাজার অবৈধ এনজিও, ুদ্রঋণদান সমিতির পাশাপাশি এমএলএম কোম্পানীসহ নানা ধরণের অপ্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে পাচার হয়ে গেছে। শেয়ারবাজার,ঋণজালিয়াতির মাধ্যমে এবং ডেস্টিনি ও যুবকের মত কোম্পানীর মাধ্যমে জনগনের অর্থ আত্মাসাতের সাথে জড়িতরা সর্বসম্মুখে চিহ্নিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত না থাকায় ুদ্র পরিসরে এমন অসংখ্য প্রতারক কোম্পানী গড়ে উঠেছে। বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থ আত্মসাৎকারী রাঘব বোয়ালদের ধরার পরও লোক দেখানো আইনী ব্যবস্থায় কর্তৃপীয় নমনীয়তার সুযোগে তারা দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথবা বছরের পর বছর ধরে জামাই আদরে নিরাপত্তা হেফাজতে থাকলেও অপরাধের শাস্তি ও আত্ম্যসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা। হাজার হাজার কোটি টাকা আত্ম্যসাৎকারিদের বিরুদ্ধেই যখন সরকার কিছু করছেনা সেখানে ৫-১০ কোটি টাকার এনজিও বা সমিতির কর্তারা টাকা নিয়ে পালিয়ে যেতেও দ্বিধা করছেনা।
দেিণর জেলাগুলোতে সিডর-আইলার মত সামুদ্রিক ঘূর্ণীঝড়ে তিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তার নামে অথবা উত্তরের জেলাগুলোতে মঙ্গা নিরসনের নামে যেমন এনজিও ও সমিতি মাইক্রো ক্রেডিট ব্যবসায় করছে, সারাদেশেও একইভাবে ুদ্রঋণ ও কিস্তিপ্রথার লেনদেন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়ভাবে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য ভ’ঁইফোড় সংগঠন। যেখানে সরকারী তফশিলি ব্যাংকগুলোই গ্রাহকের আমানত ও মূলধন হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যেতে বসেছে, সেখানে হাজার হাজার এনজিও ও সমিতির অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেশে একটি অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার প্রমান বহন করছে। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে এবং সরকারী ব্যয় নির্বাহ নিশ্চিত রাখতে সরকার একদিকে গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পণ্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এহেন বাস্তবতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দেিণর উপকূলীয় অঞ্চলে মঙ্গাপীড়িত উত্তরে এবং সারাদেশে দরিদ্র মানুষকে উচ্চসুদের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বা দাদন ব্যবসায়র ফাঁদ থেকে রার কার্যকর উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। এ েেত্র স্থানীয় প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সমাজসেবা অধিদফতরকে কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে সরকারী বেসরকারী তফসিলি ব্যাংক ও ঋণদানকারী বৈধ সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের আওতা বাড়াতে হবে এবং সব শ্রেনীর মানুষকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা গ্রহনের উপযোগি করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। এনজিও এবং সমিতির ুদ্রঋণের সুদ এবং আমানতের স্প্রেড সম্পর্কে নীতিমালা ও নিরাপত্তার আইনগত ব্যবস্থা নিয়েও সরকারের সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে।

ভাগ